শীতের দুপুর। সবে একটু চোখটা লেগে এসেছিল। আচমকা এক ঝাঁকুনিতে ধড়মড়িয়ে উঠে বসলাম। দেখি কাজল সাদা দাঁতগুলো বের করে আমার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসছে আর বলছে “কেমন ভয় দেখালাম বলো?”! মনে হচ্ছিল কয়েক ঘা দিয়ে দি ওর পিঠের ওপর কিন্তু মা বলেছে আমার রাশিতে নাকি “অতিক্রোধ হইতে বিপত্তির আশঙ্কা” লেখা রয়েছে!

– কি হয়েছে কি?
– দিদি জানো, আজ কি হয়েছে?
– বলে উদ্ধার করুন।
– আজকে ইস্কুল থেকে ফিরছি, দেখি কয়েকটা আমারই মতোন মেয়ে রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছে আর কি যেন পাউরুটির মতো গোল অনেক সবজি দেওয়া খাচ্ছে। ওইটা কি গো?
– আমি কি করে জানবো?
– আমি ওদের জিগ্গেস করতে গেছিলাম। আমায় নিয়ে খুব হাসলো আর ইংরিজিতে কিসব লিখে একটা কাগজ হাতে গুঁজে দিল।
– সেটা কই?
“এই নাও” বলেই আমার হাতে সাদা ছোট্ট চিটটা ধরিয়ে পালিয়ে গেলো কাজল। আমার গলা ফাটানো ডাক কি আর সে শোনে! এখন তো আমার বিড়াল গুলোকে সেবা শুশ্রূষা করবে সে।

কাগজটা খুলতেই দেখলাম লেখা রয়েছে ‘Hey, you idiot! Such poor. This is called Pizza!’ একরাশি বিদ্রুপাত্মক হাসি যেন ফেটে পড়ছে চারিদিকে আর বারবার বলছে ‘Hey you idiot! Poor! This is called Pizza!”
চোখ বন্ধ করে আরেকবার ঘুমানোর চেষ্টা করছিলাম কিন্তু আকাঠ দারিদ্র্যতার দরুন উপহাসের লক্ষ্য হওয়া ছোট্ট কাজলের চোখের জলের কথা ভেবেই কেমন আনচান করে উঠলো মনটা! তবে কি আজকাল মনুষ্যত্ব শেখানো হয়না কারোর বাড়িতে? নাকি এটাও স্কুলের সিলেবাসে অ্যাড করা উচিত?

কাজল এর বয়স মাত্র ছয়। পাশেই একটা স্কুলে ওয়ানে ভর্তি করে দিয়েছে আমার বাবা। ওর মা মানে রিনা মাসি গত পঁচিশ বছর ধরে আমাদের বাড়ি বাসন মাজে, ঘর মোছে। কাজলের বাবা মারা গেছে তিন বছর হলো। মদের বোতলে দুঁদ হয়ে থাকা মানুষটা প্রায়ই এদিক ওদিক পড়ে থাকতো। জীবনযন্ত্রনার এক শেষ ছিল রিনা মাসির। মারধোর অশান্তি তো রয়েছেই। এই পরিস্থিতিতে কাজলের বেড়ে ওঠা মুশকিল হবে ভেবে বাবা ওকে আমাদের বাড়িতেই রাখতে বলে। এখন অবশ্য রাতে রিনা মাসির সাথেই ফিরে যায় কাজল। আমার কাছে পড়তে বসে মাঝেসাঝেই।

– দিদি, আমি বড়ো হয়ে বিজ্ঞানী হবো।
– কেন? ডাক্তার হবিনা কেন?
– আমি বিজ্ঞানী হয়ে চাঁদে যাবো আর বাবাকে আবার নিয়ে আসব। খেলবো রান্নাবাটি আগের মতো।
– আচ্ছা। তাই হবে।
– তুমি বল্লেনা ওই কাগজটায় কি লেখা ছিল?
– আজ থেকে কুড়ি বছর পর তোকে দেখাবো।
– তুমি তখনও আমায় ভালোবাসবে?
– পড়াশুনা করলে বাসবো বৈকি।
– বেশ। করবো পড়াশুনা। তুমি বলো ভালোবাসবে তো?
– আচ্ছা। পড় এখন।

মনুষ্যত্ব 2

শুধু মায়ের কাছ থেকে অল্প সময়ের আদর পেয়ে দিন কাটানো কাজল সবসময় চাইত যেন আরো কেউ ভালোবাসুক। আমার কাছে তার মনের যত কথা সব উগলে বলতো। আমার মাকে মাসিমনি বলতে বলতে এমন অধিকার জন্মে গেছিল তার যে অন্য কাউকে মা বেশি ভালোবাসলে ঝগড়া করতেও দুবার ভাবতোনা সে। কাজল তখন ১৪ কি ১৫। আমার মামি এসেছিল মালদা থেকে। অসম্ভব আত্মকেন্দ্রিক বলে খুব ভালো সম্পর্ক আমাদের মামির সাথে কখনো ছিল না। মা যদিও কখনো খারাপ ব্যবহার করেনি। এমন ই এক রবিবার এর দুপুরে খেতে বসেছি সবাই। কাজল আমার পাশে বসে অনবরত মাংসের ঝোলের তারিফ করে যাচ্ছিল। রিনা মাসি সিঁড়িতে বসে আলতা পড়ছিল। মামি হয়তো কাজল আর রিনা মাসিকে খুব একটা ভালো চোখে দেখতো না! মা-কে রিনা মাসি আর কাজলের জন্য বাটি করে মাংস ঢালতে দেখে ,হঠাৎই মামি বলে উঠল,

– দিদি, আমাদের তো দিয়েই দিয়েছ! আবার কার জন্য ঢালছো এতটা মাংস?
– রিনা আর কাজলের রাতের খাবারের জন্য গো। এখন তো আমাদের সাথেই খেয়ে নেবে। রাতে আজ আর রান্না করতে হবেনা। বুঝলে রিনা?
– তুমি কাজের লোকদের মাথায় তুলে রেখেছ দিদি!
– কেন? কাজের লোক বলে কি সে মানুষ নয়? নাকি তার খাওয়ায় ইচ্ছে হয়না? পয়সার অভাবটা না হয় তার জীবনের সব বাঁধা বিপত্তির কারন হিসেবে আমরা নাই দেখলাম।
– তবুও দিদি। Standard matters!
– আমার অসুখের দিনে রাতভোর জেগে চোখের জল ফেলে সেবা করে খাইয়ে দিয়ে কিন্তু আমার এই ‘কাজের লোক’ ই দেখেছিল। মালদা থেকে তো একটা ফোন ও আসেনি। Standard কি আমায় বাঁচাতে পারতো?

মনুষ্যত্ব 3

মামির মুখে কোনো রা ছিলনা। মনে হচ্ছিল বিন্ধ-হিমাচল পর্বত মামির কটু কথায় তখন অবস্থান করছে। আমি মনে মনে “বেশ হয়েছে” ভাবলেও রিনা মাসির আঁচলের কোনা ততক্ষণে ভিজে গেছিল। কিছু না বলে কাজলকে নিয়ে উপরের ঘরে চলে গেছিলাম আমি। সে অবশ্য মাংস খেয়ে মহা ফুর্তিতে নেচে বেড়াচ্ছে তখন। মামি কখনো তারপর থেকে মাকে ‘কেমন আছো?’ জিজ্ঞেস করলেও দশ বার ভেবে বলতো।

দিন পেরিয়ে গেলো। আমরা বড়ো হয়ে গেলাম। পৃথিবীটা কেমন গোল গোল ঘুরতে লাগলো। অনেককিছু বদলে গেলো। কাজল এখন ব্যাঙ্গালোরে ফ্ল্যাট কিনেছে। রিনা মাসি ওখানেই থাকে। বিবাহ-যোগ্যা আমার ছোট্ট কাজল এখন মস্ত বড় এক কোম্পানির শেয়ার হোল্ডার। বাড়িতে দুজন কাজের লোক। বাবার জন্য ডাক্তার দেখাতে গিয়ে গেছিলাম দেখা করতে। ‘দিদি’ বলে জড়িয়ে ধরতেই বুঝলাম মানুষগুলো এখনো বদলায়নি। রিনা মাসির চুলে পাক ধরেছে। এখনো মা চেয়ারে বসলে, মায়ের পায়ের কাছে বসে পান বানিয়ে দেয়। কাজল আমায় ২৫০০ স্কোয়ার ফিটের আলিশান ফ্ল্যাট দেখাতে দেখাতে তার প্রেমপর্বের কথা খানিক শোনালো।

– বিয়ে করবিনা?
– ভালোবাসি দিদি। বিয়ে কপালে থাকলে হবে।
– এখনো ভালোবাসা চাস?
– হাহাহাহাহা! মানুষ কি আর বদলায়?
বুঝলাম ভালোবাসার পিপাসু সে এখনো আছে!
– পিজ্জা খাবে? চলো ফ্লুরিজ যাই।

“Hey you idiot! Such Poor! This is called Pizza” কাগজটা এখনো রয়েছে আমার কাছে। তবে আর দেখাইনি কাজলকে। সময় যে কারোর এক থাকেনা সেটা আবারো প্রমাণ হলো। সামান্য হেসে বললাম “চল যাই”।
ফিরলাম সন্ধ্যার দিকে। কাজলের চাকরির জন্য স্ট্রাগলের গল্প থেকে রিনা মাসির আর্থারাইটিস এর গল্প শুনতে শুনতে বেশ সময় কেটে গেল। রিনা মাসির হাতের পোস্তোর বড়া আর চিকেন বাটার মশালা আমার সবসময়ই ফেভারিট। গত সাত বছর খাইনি। তাই রিনা মাসি বেশ উৎসাহ নিয়ে রান্না করতে যেতেই কাজলকে দেখলাম কাউকে গলা ফাটিয়ে ডাকছে।

– মন্দিরা বৌদি, ও মন্দিরা বৌদি।
– বলো দিদি।
– ঝানু কাকিমাকেও আস্তে বলো।
হাঁফাতে হাঁফাতে কোমরে কাপড় গুঁজে দুহাতে সাবান ভর্তি নিয়ে দেখি একজন মহিলা এসে হাজির। বুঝলাম যে সে কাজ করে কাজলদের ফ্ল্যাটে। আর ঝানু কাকিমা রিনা মাসিকে দেখাশোনা করে আর ঘরদোর পরিস্কার করে।
– যাওয়ার সময় বলে যেও।
– আচ্ছা।
এই বলে দুজনেই কাজ করতে চলে গেল।

মনুষ্যত্ব 4

রাতে খেতে বসেছি। চাখিয়ে চাখিয়ে বিউলির ডাল আর পোস্তোর বড়া খাচ্ছি। দেখি দুবাটি ভর্তি মাংস আর পোস্তোর বড়া দুটো প্লাস্টিকে কাজল ভরছে। আমার মা উঠে গেল খানিক সাহায্য করতে।

– কাজল, তোর জন্য তো বেশি মাংস আর নেই বাবু?
– তাতে কি মাসিমনি? মন্দিরা বৌদির ছেলে খুব ভালবাসে খেতে। ঝানু কাকিমা এর মেয়েও বেশ চেটেপুটে খায়।
– তুই কি খাবি তাহলে?
– তুমি আমার জন্য তোমার থেকে রেখে দেবে সে আমি জানি।
মা হেসে কাজলের মাথায় হাত বোলাতেই সে তার চোখের কোনায় চিকচিক করে ওঠা জলটা মুছতে মুছতে বলে উঠলো, “কাজের লোকেদের ও তো খেতে ইচ্ছে করে! তারাও তো মানুষ! তোমার থেকেই তো শিখেছি মাসিমনি!”। জড়িয়ে ধরলো মা সেই ছোট্ট কাজলকে।

মনুষ্যত্ব স্কুল সিলেবাসে অ্যাড করতে হবেনা কখনো। কারন সেটা কেউ শেখাতে পারেনা তবে Charity starts from home!

Sharing the little you have with those in need can turn around a life without you realizing it..
  • 6
    Shares