– মনে আছে জেরী কিভাবে টমকে জ্বালাতো?
– সত্যি। আমি তো এখনো দেখি
– I swear! Same here babe. I can’t stop watching Oggy.
– হ্যারি পটার was my first love though.
– Leave these. Guys remember, the channel called Cartoon Network. I used to buy all the toys that they displayed in their showcases.
– এখনো আছে তোর কাছে?
– Ofcourse! I have everything. I can’t get over them babe!
– I never played with one toy. I had a lot.
সিগারেটের রিং ছাড়তে ছাড়তেই চলল আড্ডা। দশ গজ দূরে দাঁড়িয়ে থাকা আমি বড্ড বেমানান এসবে‌। নাম শুনেছি বটে কিন্তু চাক্ষুষ করিনি। তাও মনে সাহস নিয়ে এগিয়ে গেছিলাম জানতে।
– কি বিষয়ে কথা?
– আরে childhood memories.
– আচ্ছা।
– তোর মনে আছে টমের কথা? সিনচ্যান কত নটি ছিল!
– আমি দেখিনি কখনো!!
– What? What the fuck? Are you mad? Guys guys attention! She had spent her entire childhood by not watching cartoons and stories. Like seriously? How? একটু শেখা ভাই।
(আমায় নিয়ে হাসাহাসি কখন শেষ হয়েছে আর মনে নেই)

বাসের কালো কুচকুচে ধোঁয়া ঘিরে নিয়েছিল আমায়। যেন মনে হচ্ছিল অমাবস্যার ঘন রাত। আমি নিজেই নিজেকে দেখতে পাচ্ছিলাম না। কিছুক্ষণের স্তব্ধতা। একফোঁটা জল চোখের কোনায় চিকচিক করছিল বটে তবে আমি প্রত্যেকবারের মতো আবার সেটাকে আঙুলের কোনায় লুকিয়ে নিয়েছিলাম। অট্টহাসির কোনো উত্তর আমি দিতে পারিনি। গলায় দলা পাকানো একগাদা জটলা আবার আমায় চুপ করে জায়গা ছাড়তে বাধ্য করেছিল। তারপরই আচ্ছাদন সরে গিয়ে চকচক করে উঠলো আমার ছোটোবেলাটা।

ভাগ্যবশত কিনা জানিনা, জন্মেছিলাম চব্বিশ বছর আগে উত্তর কলকাতার বুকে। যদিও আমার দেশের বাড়ি কাটোয়া, বর্ধমান কিন্তু বাবা চাকরী সূত্রে কলকাতায় ঘাঁটি গেড়েছিল ১৯৭৫ এ। ৪৫০ টাকার ভাড়ায় টালির বাড়িতে বড় হওয়া আমি সবার আদরের দুলালি ছিলাম। আমার বাবা সরকারি চাকুরেই ছিল কিন্তু এদেশীয় বা চলতি কথায় ঘটি না হওয়ার দরুন কলকাতার মতো দামী শহরে থাকা সেইসময় কঠিনসাপেক্ষই ছিল। তাই আমার ছোটোবেলাটা তোমাদের মতো কাটেনি।

একটা ছোট্ট ঘরে রান্না খাওয়া ঘুমানো দিনযাপন কেমন তা আমি জানি। তোমাদের মতো লুকোচুরি খেলার সময় ডাইনিং রুমের সুসজ্জিত সোফার পিছনে আমি লুকোতে পারিনি। আমি দৌড়ে এসে মায়ের আঁচলের নিচে লুকিয়েছি। ক্লাসে প্রথম হলে আমি পুরস্কার হিসেবে নিজের উচ্চতার সমান বার্বি ডল পাইনি, তবে সবার কোলে ঘুরে বেড়াতে পেরেছি। আমার বাড়িতে থরে থরে খেলনা সাজানো নেই, তবে অংকে একশো পেয়ে মায়ের কিনে দেওয়া কম্পিউটার খেলনাটায় এখনো ব্যাটারি আছে। আমি দূর্গাপূজোয় বিদেশ ঘুরতে যাইনি, আমি কাটোয়ায় নিজের বাড়ি গেছি। আমি এয়ার কন্ডিশনড্ স্কুলগাড়িতে নয়, মায়ের সাথে গল্প করতে করতে হেঁটে স্কুল গেছি। সেই বাস ভাড়া জমিয়ে পুজোর জামা কিনেছি। আমি দূরের নামিদামী DPS বা Xavier’s এর মতো ইংরিজি মিডিয়াম এ পড়িনি বরং হাঁটাসম্ভব পথের বাংলা মিডিয়ামে পড়ে শেক্সপিয়ারকে ভালোবেসেছি। বাংলা লিখতে পড়তে পারিনা বলা গর্বিত মানুষদের সামনে বাংলা ইংরেজি দুটোতেই সমান দক্ষ হওয়ার জন্য আপ্রাণ খেটেছি আমি। আমি ব্র্যান্ডেড শীতের জ্যাকেট পড়িনি, মায়ের বোনা সোয়েটার মাফলার পড়েছি। বৃষ্টি হলে জানালায় বসে পিজ্জা খেতে খেতে কার্টুন দেখনি। আমি বিছানায় জলের বালতি রেখে মায়ের সাথে খাটের তলায় বসে ইকিরমিকির খেলেছি। বর্ষাকাল এলেই বাবাকে রোজ জিগ্গেস করতে শুনেছি, “আজ কি খুব জল পড়েছে চাল থেকে? বেশি বাজ পড়লে খাটের তলায় বসে থেকো!”
নাহ্ আমার ছোটোবেলাটা তোমাদের মতো কাটেনি।

অফুরন্ত জলে বসে আমি খেলতে পারিনি কারন কয়েক বালতি জলে সারাদিন কাটাতে হয়েছে। সকাল ১০টায় ঘুম থেকে উঠে যখন ইচ্ছা স্নান করতে পারিনি কারন সময়ের জলকল ঠিকভাবে ব্যবহার করতে হয়। আমি তোমাদের মতো প্রত্যেকটা চকলেটের স্বাদ জানিনা কারন আমি শুধু মামা আসলে, একটা বড়ো ডেয়ারী মিল্ক পেয়েছি। বার্বি ডলের চুল আঁচড়াতে আমি জানিনা কারন আমি শুধু ছোটো চার পাঁচটা পুতুলে রান্নাবাটি খেলেছি। আমি অকারনে ইংলিশ বলতে জানিনা কারন বাংলা মিডিয়ামে শুধু দরকারে ইংরিজি বলতে শিখেছি। আমি ভালো খাবার একা খেতে পারিনা কারন একটা মাত্র মেয়ে হওয়ার জন্য হিংসুটে হয়ে যাবো বলে দুটাকার ভুজিয়াও সারা বাড়ির সাথে ভাগ করে খেতে শিখেয়েছে মা। আমি কাউকে মুখের ওপর উত্তর করতে পারিনা কারন তার কোনো ভাবে খারাপ লাগলে আমায় ভগবান পাপ দেবে বলেছে বাবা। কাউকে ‘বস্তির লোক’ বলে গালাগালি করলে কেঁদে ফেলি আমি কারন ১৫ বছর আমি তাদের সাথেই থেকেছি। আমি বড় হয়েছি বস্তিতে, নিজের নামও লিখতে না পারা মানুষদের সাথে। আজ মনে হয় আমার ছোটোবেলাটা সত্যি খুব ভালো কেটেছে।

ফিরে দেখা ছোটোবেলা 2

সেদিন আমি বলতে পারিনি যে নাহ্ আমি জানিনা কার্টুন এর নাম কারন আমি টিভি দেখতে দেখতে খাইনি। মায়ের গল্প শুনে খেয়েছি। আমি বলতে পারিনি যে আমার বাড়িতে টিভিই এসেছে আমি উচ্চমাধ্যমিক দেওয়ার পর। এইজন্য নয় যে কেবল্ লাইনের টাকা দেওয়ার সামর্থ্য আমার বাবার ছিলনা, বরং এইজন্য যাতে আমি পড়ালেখা ঠিকভাবে করি। যদিও সেটা আমি এখন বুঝি। ফোন থাকলেও আমি মাকে ব্যবহার করতে দেখিনি, রাতদিন বই পড়তে দেখেছি। কেউ বকলে আর আমি বাড়ি এসে চেঁচালে মাকে বলতে শুনেছি, “তুই ই কিছু করেছিস!”। ইংরিজি পড়তাম যার কাছে তার কাছে মার খেয়ে ফেরা সেভেনে পড়া ছোটো আমি খুব কেঁদেছিলাম আর যাবোনা বলে, তাতেও মাকে বলতে শুনেছি, “শিখতে গেলে বকা খেতে হয়”! নাহ্ আমি তোমাদের মতো বড়ো হইনি।

“I never played with one toy. I had a lot”
বদলেছে সময়, বড় হয়ে গেছি আমরা। এই উক্তিটা একই রয়ে গেছে। শুধু খেলনা এখন মানুষ হয়ে গেছে। এক লহমায় এক ভালোবাসার মানুষ ছেড়ে আরেকজনের বুকে হাতে মাথা রেখে “সাথে থাকব” বলা তোমাদের দেখলে মনে হয় আকাশচুম্বী ২৫০০ স্কোয়ার ফিটের ফ্ল্যাটে অগির সাথে বড়ো না হয়ে, ‘বস্তির লোক’ দের সাথে বেড়ে ওঠা আমি ভাগ্যবতী ছিলাম বটে। পাশে বসা দুদিনের বয়ফ্রেন্ডকে অনবরত অন্যের বাবা মা তুলে খিস্তাখিস্তি করতে দেখেও হাসতে থাকা DPS এর প্রাক্তনি, ইংলিশ মিডিয়ামে কি ‘Basic Ethics of Humanity’ ও শেখায়না?

আসলে আমি জানিনা কারন আমার ছোটোবেলাটা তোমাদের মতো কাটেনি।

Sharing the little you have with those in need can turn around a life without you realizing it..
  • 1
    Share