– ও বৌদিদি কি করতাসো?
– করার মধ্যে আর আসেই বা কি! ঠাউরপো রে একবার আওয়াজ দেও দিকি।
– সে না হয় দেবোখন্। তুমি আমারে কও এট্টা কথা।
– কি?
– এই যে ময়মনসিংহ ছাইড়া বরিশাল আইলা, মন খারাপ করেনা?
– বিয়া হইলে তুইও যাবিগা।
– আমি তো বাপ মা ভাই বোন আর তোমারে ছাইড়া কোথ্থাও নড়ুমনা। দ্যাখবাখন্!
– হ্! সুন্দরী বইলা কথা। তুইল্যা নিয়া যাবে তোরে।
– আমি সুন্দর? এ কি কও?
– ঢের। এখন যা দেখি। কাম ধাম নাই না?
– ছোড়দারে ডাক দিবো কি আর?
– হ্যাঁ। ব্যাটার আজ পিঠের চামড়া গুটাইবো।

সাল ১৯৪৩। তখনও ভারতবর্ষ ইংরেজদের কবলে বন্দি। বাংলাদেশে হিন্দুদের ওপর অত্যাচার বেড়েই চলেছে। আমার ঠাম্মা ময়মনসিংহের মেয়ে ছিলেন। সেই যুগের ম্যাট্রিক পাশ করে বিয়ে হয় বরিশালের নাম করা ডাক্তারের সাথে। দেওর ননদ্ নিয়ে ছোটো বয়সে সংসার করতে আসা ঠাম্মার একমাত্র সঙ্গী ছিলো কমলিনী ঠাম্মা।পাশের বাড়ির মেয়ে। বৌদিদি বলতো আমার ঠাম্মাকে। শুনেছি অসম্ভব সুন্দরী ছিলেন। গায়ের রং দেখলে মনে হতো সদ্য কোনো ফুলের কুঁড়ি ফুটেছে। বাবা মা এর একমাত্র মেয়ে হওয়ার দৌলতে কোনোদিন অভাবের সাথে লড়তে হয়নি। যখন যেমন দরকার পড়ত তখনই ছুটে আসত কমলিনী ঠাম্মা। অসুখবিসুখে রাতের পর রাত সেবা করতেও পিছপা হয়নি কখনো। সম্পর্ক আসতে আসতে এত গাঢ় হয়েছিল যেন মনে হত সে ঠাম্মার আপন ননদ্।

ক্ষমাপ্রার্থী 2

সময় বয়ে চলেছিল। ভারত তখন সদ্য স্বাধীনতা লাভ করেছে। মুজিবুর রহমান বাংলাদেশকে স্বাধীন করতে ঐক্যবদ্ধতার ডাক দিয়েছেন। ১৯৪৭ সালে ভারত তো স্বাধীন হয়ে গেছিল কিন্তু তার সাথে ইস্টবেঙ্গল আর পাকিস্তানকে আলাদা দেশে ভাগ হতে হয়েছিল। এমনটা মনে হয়েছিল যেন এক মায়েরই দুই সন্তানকে আলাদা করে দেওয়া হলো। অনাহার, দুর্ভিক্ষ, হাহাকারে যেন চারিদিক জর্জরিত হয়েছিল। মুসলিম সম্প্রদায় অস্বাভাবিক অত্যাচার শুরু করেছিল। বাংলাদেশে  তখন রক্তপাতের পদ্মা। সেখানে বাঁচা দায়। আমার ঠাম্মা তখন সাত ছেলেমেয়ে নিয়ে রাতারাতি ইন্ডিয়া চলে আসে। বাড়িঘর , জায়গা জমি, সম্পত্তি, আত্মীয়, চেনাপরিজন সব ছেড়ে। একমুঠো খাবার জোগাড়ের জো ছিলনা। দাদু রয়ে গিয়েছিল বাংলাদেশে কোথাও লুকিয়ে। সেখান থেকে টাকা ইন্ডিয়ায় এলে তবেই নাকি সংসার চলত। আমার বাবা চার আনার জন্য রেললাইনের পাড়ের গেঞ্জি কারখানায় গাঁট দিতেও যেত। বাংলাদেশ ফেরত উদ্বাস্তুদের এই বিদেশবিভুঁইতে পা রেখে বাঁচতে এতটাই কষ্ট করতে হয়েছে। আর কখনো দেখা হয়নি কমলিনী ঠাম্মার সাথে। যুদ্ধ, দেশভাগ, রক্তপাত সব কিছু ছিন্নবিচ্ছিন্ন করে দিয়েছিল। শুধু প্রানটা তখনও ছিলো।

সাল ১৯৭২। আমার বাবা চাকরি সূত্রে কলকাতায় এসেছিল। ভাড়া বাড়ীতে ২টাকা দেওয়ার ক্ষমতাও ছিলনা। পাউরুটি কারখানাতেও তাকে ঘুমিয়ে রাত পার করতে হয়েছে। আস্তে আস্তে পড়াশোনা তারপর সরকারী চাকরি। কলকাতায় একটু মাথা গুঁজতে বারো বছর পেরিয়ে গেছিল। ঠাম্মা তখনও কাটোয়ায়। ও হ্যাঁ, আমার দেশের বাড়ি বর্ধমানের কাটোয়ায়। যাইহোক, কিছুদিনের জন্য কলকাতায় এসেছিল ডাক্তার দেখাতে। পড়াশোনা জানার সুবাদে এদিক ওদিক নিজেই বেড়িয়ে পড়ত। এমনই একদিন হরিতুকি লেনের কাছে একটা বাড়ির সামনে একটি মহিলা তার লম্বা চুল শোকাচ্ছিল। কি মনে হওয়াতে ঠাম্মা তাকে একটি ঠিকানা জিজ্ঞেস করতে এগিয়ে যায়। জানা হলে ঠাম্মা যখন একটু এগিয়েছে, সেই মহিলা হঠাৎ বলে ওঠেন “বৌদিদি?”

মাঝখানে টানা তিরিশ বছর। যোগাযোগহীন জীবনেও কেউ এভাবে ফিরে আসবে ঠাম্মা বোধহয় ভাবতেও পারিনি।
– কমলিনী?
– বৌদিদি!!
চোখের জলও সেদিন বাঁধ ভেঙেছিল।
– কিরে তুই নাকি বিয়া করবিনা?
– তুইল্যা নিয়া আইলো যে!
– হ্। ভাল্লাগে এইখানে?
– কখনো লাগে গো! পদ্মার কথা খুব মনে পড়ে গো।
– কয় ছেলেমেয়ে তোর?
– তিন মেয়ে আর পাঁচ পাঁচটা ছেলে গো।
– মেয়ে আছে তবে। তাইলে তোর লক্ষী আছে।
– ছেলেরাও আমার বীর গো।
ছেলেদের নিয়ে অসম্ভব গর্বিত ছিলো কমলিনী ঠাম্মা। পরিচয় থেকে পরিবার হতে সময় লাগেনি। কমলিনী ঠাম্মার ছেলেরা আর আমার বাবা একই সাথে রাজনীতি করতো। একসাথেই বেড়ে ওঠা। তারাও চক্রবর্তী। অনেকে তো ভাবতো একটাই পরিবার। আসলে সম্পর্কটা যে সেই সোনার বাংলার পাড়ের।

ক্ষমাপ্রার্থী 3

আমার ঠাম্মা মারা যায় ১৯৯৯। কমলিনী ঠাম্মা খুব কেঁদেছিল। এখনো মনে পড়ে “বৌদিদি যেওনা” বলে তাঁকে ফুঁপিয়ে চোখ মুছতে। আমি তখন সবে চার কি পাঁচ। কিন্তু সময় আর স্রোত কারোর জন্যে অপেক্ষারত থাকেনা। “মা বলেছে, এটা করতেই হবে। বাড়িতে টাকা পাঠাতেই হবে। মা ভাইদের কোনো কষ্ট হচ্ছে না তো?” ইত্যাদি বাবার মুখে প্রতিনিয়ত শুনে বড়ো হয়ে ওঠা আমি সবসময় জানতাম যারা পরিবারের, তাদের জন্য সব করতে হয়। বৃদ্ধাশ্রম খোলার স্বপ্নটা এই বয়স থেকেই বুনতে শুরু করেছিলাম। রাস্তায় কোনো বুড়িকে ভিক্ষা চাইতে দেখলে বাবা এখনো বলে যে আমার মা বেঁচে থাকলে এখন কত ভালো থাকত! এই শিক্ষায় বেড়ে ওঠা আমি সবসময় ভাবতাম কোনো বয়স্ক মানুষকে যেন কষ্টে না থাকতে হয়। ভাবতাম কবে আসবে বৃদ্ধাশ্রম চালানোর মতো ক্ষমতা।

কমলিনী ঠাম্মার পাঁচ ছেলেই কর্মরত। বিয়ে থা করে সংসার ও আছে। নাতিপুতি নিয়েই ভালোই ছিলো ঠাম্মা। মা আর আমি প্রায়ই যেতাম আর বরিশালের অনেক গল্প শুনতাম। তখনও তেমনি সুন্দরী, গায়ের রং যেন ফেটে পড়ত। আমি আবার গায়ে গা ঘষতাম, ফর্সা রং নেবো বলে। কত কি খাওয়াতো! আমি বড়ো হয়ে গেলাম, সময় বদলে গেলো, ঠাম্মার গলার চামড়াগুলো আস্তে আস্তে ঝুলে গেল। বুক ফুলিয়ে বলা “আমি পাঁচ ছেলের মা” ধীরে ধীরে একা থাকতে শুরু করলো। কারন তার ছেলের বউদের নাকি টালির বাড়ীতে দম আটকাতো! “আমি বরিশালের মেয়ে। বুঝলে বৌমা? একা করে নেবো” বলা জেদি কমলিনী ঠাম্মা নিজে রান্না করতো। মেয়েরা আসতো বৈকি কিন্তু তাদের বাড়ি গিয়ে থাকলে নাকি সম্মান খুইবে। জ্বর জ্বালা অসুখে ধীরে ধীরে শয্যাশায়ী হয়ে গিয়েছিল। তাঁর পাঁচ ছেলে এবং তাগড়া নাতি নাতনীদের কখনো মনে হয়নি ঠাম্মার কাছে একবার এসে বসতে। একবার তার শরীর কেমন আছে জানতে। রক্তের সম্পর্ক সবসময়ই বাইরের কারোর থেকে আগে এগিয়ে থাকে।

দুর্দশা আরো চেপে বসেছিল। অভাবে দিশাহারা হয়ে গেছিল তাঁর চারিদিক। বাংলাদেশের বিঘার পর বিঘা জমির মালিকের একমাত্র মেয়ের এমন করুণ অবস্থা দেখে একবার ভেতরে ভেতরে ভেবেছিলাম যে ভারত তো ভাগ না হতেও পারতো। তাহলে হয়তো ঠাম্মাকে এই দিনগুলো দেখতে হতোনা। বাবা রোজ বলতো ঠাম্মার ছেলেদের তাঁকে তাদের দায়িত্বে রাখার কথা কিন্তু কেউ কর্নপাতই করেনি। আমি আর যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছিলাম। মা প্রায়ই ঠাম্মা যা ভালোবাসতো তাই বানিয়ে নিয়ে যেত। রোগাক্রান্ত হয়ে বিছানায় পড়া ঠাম্মা রোগা হয়ে যাওয়ার পড়েও সৌন্দর্যের আভা যেন তখনো ঝলকাতো। দিন দিন লোকজন চিনতে পারতোনা। নিজের মেয়েদের বা আমার মাকেও বুঝতে পারতোনা। শুধু ছেলেদের কথা বলতো আর বাংলাদেশের সব স্মৃতি মনে করতো। অসহায় অবহেলায় দারিদ্র্যতায় কমলিনী ঠাম্মা আর বাঁচতে পারলোনা। শেষ দিনে শুধু মেয়েরা ছিল সাথে। ছেলে আর নাতিরা খুব ‘ব্যস্ত’!
আমার বৃদ্ধাশ্রমের স্বপ্ন আবার একবার চুরমার হয়ে গেল। এমন মনে হলো যেন আমি আবার ব্যর্থ হলাম। চোখের সামনে এত কাছের একজনকে চলে যেতে দেখে আবার হাত পা গুটিয়ে বসে রইলাম। আমি আবার কিছু করতে পারলাম না।

ক্ষমাপ্রার্থী 4

ঠাম্মা মারা যাওয়ার ছয় সাত মাস পরের ঘটনা। ঠাম্মার সেজ ছেলের বউ এর সাথে মা এর একটা ছোট্ট কথোপকথনের সাক্ষী ছিলাম আমি:
– হ্যালো?
– হ্যাঁ। আমি নিরূপমা। কেমন আছো?
– এই ভালোই। আপনি?
– আমি মোটামুটি। পায়ে ব্যাথা।
– আপনার ছেলে কি দিল্লি চলে গেছে?
– হুম্।
– কবে আসবে?
– জানিনা। এখন বিয়ে হয়ে গেছে। বলেছে আলাদা থাকবে। এটা কেউ মা এর সাথে করে বলো? এক ছেলে আমার!
– এটা আপনি বোঝেন? কমলিনী মাসিমার ও তো আপনি ছেলের বউ ছিলেন। তাই না?

আর কখনও মাকে ফোন করেনি সেই কাকিমা।
পরজন্ম বলে কিছু নেই বলেই বিশ্বাস আমার। পাপের শাস্তি এখানে এই ধরিত্রীর বুকেই পেতে হবে। তবে আমি চিরকাল ক্ষমাপ্রার্থী থাকব যে এতদিনে আমি আমার জীবনের বৃদ্ধাশ্রমের স্বপ্ন পূর্ণ করার মতো সবল হয়ে যেতে পারলে হয়তো কমলিনী ঠাম্মা আজ ইলিশ মাছের পোলাও কিভাবে রান্না করে বরিশালের লোকেরা, তা বলতো।

পারিনি ঠাম্মা। পারিনি আমি।

এরকম ভাবেই তো কত জীবন নষ্ট হয় তাইনা? তবে Karma is a Bitch!

Sharing the little you have with those in need can turn around a life without you realizing it..
  • 1
    Share