“তুতুল, অ্যাই তুতুল..!! এদিকে আয় মা, সমুদ্রের ধারে যাস না।”- প্রবীর বাবু উদ্বিগ্ন আওয়াজে রূপা দেবী এগিয়ে এলেন।
“কি হলো তোমার, এতো চেচামেচি করছো কেনো তুমি?”- রূপা দেবী বললেন।
“আরে, দেখো না, তুতুল টা এতো দুরন্ত হয়েছে.. খালি সমুদ্রের দিকে চলে যাচ্ছে।”- প্রবীর বাবু।
“তা তুমি ই বা এতো টেনশন নিচ্ছ কেনো, সমুদ্রের ধারে এলে মানুষ আর কি করবে শুনি?”- রূপা দেবী।
“কী যে বলো না তুমি.. ওই টুকু বাচ্চা, একবার ঢেউ এর মুখে পড়লে কি হবে ভাবো একবার,..” – প্রবীর বাবু উদ্বিগ্ন স্বরে বললেন।
“থামো তো, তুতুল কে নিয়ে তোমার খালি বাড়াবাড়ি.. তা মশাই এতো ছোট নেই তোমার মেয়ে, এগারো পেরিয়ে বারো হলো, এখনো কোলছাড়া করলে না ।- রূপা হেসে বলে উঠলেন।

কেন এতো অচেনা হলে? 2

ততক্ষনে তুতুল দৌড়ে এসছে বাবার কাছে।
“না বাপী, আমি তো খালি ওইদিক টা একটু দেখছিলাম। সমুদ্রে নামিনি তো..”
প্রবীর বাবু খুশি হলেন মনে হলো, তিনি হাসি মুখে তুতুলের হাত ধরলেন। রূপা দেবীর দিকে ঘুরে আস্তে করে বললেন, “সে তুমি যা ই বলো, তুতুল চিরটাকাল আমার চোখে এরম ছোটই থাকবে, আর আমি ওর হাত সবসময়ই শক্ত করে ধরে থাকবো”..
“চলো তুতু সোনা, আমরা এবার সমুদ্রে নামি। তুমি কিন্তু খবরদার আমার হাত ছাড়বে না, শক্ত করে ধরে রাখবে, ঠিক তো?”- সিরিয়াস স্বরে প্রবীর বাবু প্রশ্ন করলেন।
শক্ত করে হাত টা ধরে তুতুল বললো “ওকে বাপী!”
দুজনে মিলে দৌড় দিল গর্জনরত জলধারার দিকে। পিছনে দাঁড়িয়ে রূপা দেবী চোখ ভরে বাবা মেয়ের হুটোপুটি আর উল্লাস দেখতে লাগলেন।

তিয়াশা নিজের মনে লেখালেখি করছিল ঘরে বসে। নতুন লেখার খসড়া করতে করতে এলোমেলো চিন্তা গুলো সাজাতে চেষ্টা করছিল এক মনে। আজকাল আর কোনো কিছুতেই তার মন বসতে চায় না, জোর করে মন বসাতে হয়। শুভম চলে যাওয়ার পর থেকে আর কোনো কিছুই করার ইচ্ছা জাগেনা তার মনে। তবু কিছুটা জোর করেই আজ লেখাটা নিয়ে বসেছে সে, লেখাটা তাকে কমপ্লিট করতে হবে আজকের মধ্যে, ডেডলাইন পার হলে চলবে না।

শুভম যে তাকে এভাবে ডিচ্ করতে পারবে তা ও কোনো দুঃস্বপ্নে ও ভাবতে পারেনি। কলেজ থেকেই দুজনে ছিলো পারফেক্ট ম্যাচ, বন্ধুদের ভাষায় ‘ এক দুঁজে কে লিয়ে’ । শুভমের পড়া হয়নি, তিয়াশা তৈরি করে দিয়েছে, তিয়াশার জ্বর, শুভম বাড়ি এসে হাজির পুরো সপ্তাহের নোটস নিয়ে, পরীক্ষার জন্য একসাথে প্রিপারেশন করা, চাকরির আবেদন জমা দেওয়া, ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখা, তিয়াশার জীবনে কোথাও কোনো ফাঁক ছিলো না।
বাড়ীতে মা বাপী ও সব জানতেন।

কলেজ শেষে তিয়াশা এক মিডিয়া হাউসে ঢুকলো, ইন্টার্নশিপ নিয়ে আর শুভম চাকরির পরীক্ষায় বসছিল। শুভম চাকরী টা পাওয়ার পর ও তো ওরা দুজনে মিলে সেলিব্রেট করলো। তখন তিয়াশা ঘুণাক্ষরেও ভাবতে পারেনি এই তো সবে শেষের শুরু।
যেখানে তিয়াশার মনে হয়েছিল এবার তারা এক হতে চলেছে, আসলে সে দেখতে পায়নি তাদের দুজনের মাঝে দুরত্ব অনেক গুণ বেড়ে গেলো।
শুভমের অবহেলা, সময় না দেওয়া, ধীরে ধীরে সম্পর্ক থেকে বেড়িয়ে যাওয়া তিয়াশা কে পুরোপুরি ভেঙে দিয়ে গেছে। শুভম কিছু দিন হলো পরিষ্কার করে দিয়েছে যে তাদের দুজনের পথ আজ আর এক নেই।

কেন এতো অচেনা হলে? 3

তিয়াশার সঙ্গী আজ তার এই একলা ঘর। আস্তে আস্তে মানিয়ে নিচ্ছে তিয়াশা। ঝটিতি ভাবে ও, আর কিই বা করতে পারি। মেনে আমায় নিতেই হবে যখন..
ফ্রিল্যান্সিং এ টুকটাক কিছু প্রবন্ধ, ফিচার লিখছে এখন। নতুন কোথাও জয়েন করার ইচ্ছা ই হয় না তার। কি হবে.. তার চেয়ে এই বেশ ভাল। নিজের পড়াশুনা আর এই কাজ গুলো নিয়েই নাহয় কেটে যাবে দিন গুলো। দ্রুত কাগজে কলম চলতে থাকে তিয়াশার।
এটা শেষ করে খাবার টেবিলে বসে পড়তে হবে, নইলে মা আবার ঘরে ঢুকে অবেলায় খাওয়া নিয়ে গজগজ করতে আসবে। তার চেয়ে ভালো, ও নিজে গিয়েই সোনামুখ করে খেতে বসে যাবে। ইশ্, বাপির সাথে কতদিন একসাথে খেতে বসা হয়নি, বাপি ও কিরম আজকাল আর তাকে ডাকেনা। বাপি কি একটুও মিস করছে না তার তুতুলকে?

খাবার টেবিলের দিকে নিজেই তুতুল কে এগিয়ে আসতে দেখে রূপা দেবী খুশি হলেন। তার ই কি আর ভাল্লাগে রোজ রোজ কানের পাশে গিয়ে ওঠ রে, খা রে বলে বলে কাজ করাতে? কোন মায়ের ভালো লাগে মেয়েকে এরম নিঝুম হয়ে চুপচাপ একলা বসে আছে দেখতে।

তার তুতুল তো এরম না, যেখানে যায় হৈ হৈ করে মাতিয়ে রাখে.. কি যে হলো শুভমের সাথে সম্পর্ক টা ভাঙার পর, তুতুল তো নিজেকে ঘরবন্দী করে নিল।
” এদিকে বস তুতুল, দেখ আজকে তোর ফেভারিট পাবদার ঝাল বানিয়েছি, খেয়ে দেখ তো!”- রূপা দেবী বললেন।
“দারুন হয়েছে, মা” তুতুল খেতে খেতে বললো। কিন্তু বাপি কিছু বলছে না কেনো? তুতুল মুখ তুলে দেখলো বাপি একমনে খেয়ে যাচ্ছে, তার দিকে তাকালো ও না। কি হল বাপির আবার..

খাওয়া শেষ করে হাত ধুয়ে বাপির পাশের চেয়ার টা টেনে বসলো তুতুল। “বাপি তুমি কি আমায় ইগনোর করছ?”
– ” হম্, কি করবো বলো। সব জিনিস নিয়ে অপছন্দ গুলো স্পষ্ট বলা যায় না”- প্রবীর বাবু গম্ভীর গলায় বললেন।
– “বাপি আমায় বল কি অপছন্দ তোমার আমায় নিয়ে, আমি শুনতে চাই”- তিয়াশা সরাসরি জানতে চাইলো।
– তুই কি ঠিক করেছিস? অফিস যাচ্ছিস না, না বাইরে বেরোস,.. পড়াশুনা শেষ করে বাড়ি তে বসে থাকবি বলে ডিগ্রী টা নিলি?”

তিয়াশার ভুরু কুঁচকে উঠলেও সামলে নিয়ে বললো ” তুমি ঠিক কি মিন করছো বাপি? আমি ঘরে বসে ও টুকটাক কাজ করার চেষ্টা করছি, বাড়ীতে এমনি বসে নেই..”
“সেই টুকটাক কাজে আর কি হয়, চাকরী বাকরী তো পেলে না আর। আজ যে এই পাবদা মাছ টা খেলে, আইডিয়া আছে তোমার এর বাজারদর কত? কিভাবে থাকবে? তোমায় তো আর সংসার চালাতে হবেনা। সেটা এই বুড়ো বয়সে ও আমার ই দায়িত্ব”- প্রবীর বাবু বলে চলেন..”এটা জেনে রাখ তুতুল এই টুকটাক কাজে আমার কোনো সুরাহা হয় না,.. ভেবেছিলাম তোকে শিক্ষা দিয়েছি এবার নিজের পায়ে দাঁড়াতে দেখবো, কিন্তু সে আমি ভুল ভেবেছিলাম। তোর নিজের উপরই সে ভরসা নেই, আমার কিংবা তোর * দায়িত্ব আর কি নিবি? তোর উপর আমার আর কোনো আশা নেই।”

তিয়াশা কোনো রকমে কান্না চেপে উঠে গেলো নিজের ঘরে। বাপি আমাকে এরম বলতে পারলো? এরকমই ভাবে ওরা সবাই আমায় নিয়ে না?.. নিজের চারপাশে ছড়ানো ছিটানো বই পত্র আর উলুস্থুলু বিছানার দিকে চেয়ে তুতুল বুঝলো বাপি কিছু ভুল বলেনি। তার জীবন টা এই ঘরটার মতোই অগোছালো হয়ে গেছে।

নাহ্, অনেক হয়েছে, এবার জবাব দিতে হবে এদের সবাইকে।
বই খাতা গুলো এক জায়গায় রাখতে রাখতেই ইতিকর্তব্য ভেবে নিল, কয়েকদিন আগে ইমেল এ আসা অফার টা এবার তিয়াশা অ্যাকসেপ্ট করে নেবে। আজ ই রিপ্লাই ব্যাক করে দেবে ওদেরকে ও, অফার টা মুম্বাই এর ভেবে ও দোনামনা করছিল, মা বাপি আর বাড়ি ছেড়ে অত দুর যেতে মন সায় দিচ্ছিল না। কিন্তু এখানে থেকেই বা ও কি করতে পারছে? বরং তার কাছের মানুষেরাই সবাই দূরে চলে যাচ্ছে, তাহলে কাছে থেকে লাভ কি? তার চেয়ে বেড়িয়ে পরাই ভালো।

কেন এতো অচেনা হলে? 4

সত্যি তো বাপির রিটায়ারমেন্টের সময় চলে এলো, সংসার চালানোর দায়িত্ব এবার তারই উপর বর্তায়, চোয়াল শক্ত হলো তুতুলের : মুভ অন তিয়াশা! কাম অন, ইউ ক্যান ডু ইট!

প্রবীর বাবু খবরের কাগজটা ভাঁজ করে নিজের ঘরে ঢুকলেন। আজ অনেক কথা বলতে হল তুতুলকে, হয়তো তুতুল তাকে ভুল ই বুঝবে, কিন্তু এগুলো বলা জরুরি ছিল। তার মেয়েকে তো তিনি চেনেন.. ও যে কতো খানি আঘাত পেয়েছে সেটাও তিনি জানেন, আত্মবিশ্বাস হারিয়ে ঘর বন্দী হওয়ার মত মেয়ে তুতুল না।
তুতুলের এই ভেঙে পড়া থেকে উঠে দাঁড়ানোর জন্যে এই ধাক্কাটা দেওয়া দরকার, তার জন্যে প্রবীর বাবু নিজেকে প্রস্তুত করেছেন।

-“তুই আমাকে ক্ষমা করিস তুতুল, আমি তোকে চিরকাল আগলে রেখেছি কোনোদিন তোকে একা ছেড়ে দিইনি।
কিন্তু এখন তুই বড়ো হয়েছিস মা, এর আগের পথ টা যে তোকে একা ই এগোতে হবে। তোর হাত আমি ছাড়লেও, তোর পাশে আমি চিরকালই থাকবো।
তোর উপর আমার অগাধ বিশ্বাস রে তুতু, তুই সব সামলে ঠিক এগিয়ে যাবি আমি জানি।”
চোখের কোণে জমা জল মুছে নিয়ে প্রবীর বাবু তাকালেন মেয়ের বন্ধ ঘরের দরজার দিকে অনেক আশা নিয়ে।